রক্ত কমে গেলে কি খাওয়া উচিত

রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেলে তাকে রক্তস্বল্পতা বা রক্তশূন্যতা বা এনেমিয়া বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে অনেক মানুষ রক্তস্বল্পতা রোগে ভোগে। বিশেষ করে বয়ষ্ক মানুষ এবং নারীদের এই সমস্যা বেশি হয়। যারা পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত থাকে তাদের রক্তস্বল্পতার প্রবণতা বেশি দেখা যায় । রক্তস্বল্পতা রোগের চিকিৎসার জন্য প্রথমে পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায়। যেসব খাবারের রক্তস্বল্পতা দূর করার ক্ষমতা রয়েছে সেসব খাবার নিয়মিত খেতে হবে।  আমলার জুস ও লাল বিটরুটের জুস খাওয়ার অভ্যাস গড়তে পারেন এটি রক্তাল্পতা রোধের জন্য খুবই উপকারী। এই উপকারী জুসের কারণে রক্তের মধ্যে তাজা অক্সিজেন সরবরাহ হয়। এছাড়া প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে অ্যানিমিয়ার প্রকোপ থেকে দ্রুত রেহাই পাওয়া যায়। রক্তস্বল্পতা হলে শরীর দুর্বল  হয়ে আসে, কর্মক্ষমতা লোপ পায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই রক্তশূন্যতায় খাবারের দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। শুধু মাত্র পুষ্টিকর কিছু খাবার খেয়েই রক্তশূন্যতা থেকে তাড়াতাড়ি রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

 

রক্ত কমে গেলে কি খাওয়া উচিত?

 

 রক্ত কমে যাওয়ার সমস্যা থেকে সমাধান পেতে আমাদের প্রতিদিন কিছু খাবার খেতে হবে ,যেগুলো খেলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। 

 

  • কলিজা: কলিজায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ভিটামিন বি থাকে । রক্তস্বল্পতা রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেহে আয়রনের ঘাটতি। তাই যারা রক্তসল্পতায় ভুগছেন তাদের অবশ্যই আয়রন জাতীয় খাবার খাওয়া  উচিৎ। খাসি বা গরুর কলিজায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। তবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে তাদের অবশ্যই গরুর কলিজা থেকে দূরে থাকতে হবে।

 

  • দুধ: দুধ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও প্রোটিন যোগাতে সাহায্য করে। দুধে খুব বেশি পরিমাণে আয়রন না থাকলেও এতে প্রায় সব রকমের ভিটামিন আছে। এছাড়াও দুধে আছে পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম। এই খাদ্য উপাদানগুলো রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়তে সাহায্য করে আর রক্তে হিমোগ্লোবিন থাকলে রক্তশূণ্যতা দূর হয়ে যাবে। তাই রক্তশূন্যতার রোগীদের জন্য নিয়মিত দুধ খাওয়া উপকারী।

 

  • মাছ: আয়রনের আরেকটি প্রধান উৎস হল মাছ, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ। তাছাড়া ছোট মাছ যেমন-শিং মাছ, টেংরা মাছ ইত্যাদি সব মাছেই রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। তাই রক্তস্বল্পতা রোগ থেকে দেহকে মুক্ত রাখতে প্রতিদিন মাছ খাওয়ার চেষ্টা করবেন।

 

  • ফলমূল: ফলমূলে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। প্রতিদিন আয়রনযুক্ত ফল যেমন আপেল, টমেটো, বেদানা, কলা, আঙ্গুর, কমলা, গাজর ইত্যাদি খেলে রক্তশূন্যতা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাই আয়রন গ্রহণ করতে প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ২-৩ টি ফল খেতে ভুলবেন না।

 

  • খেজুর:পুষ্টি উপাদানের অন্যতম সেরা উৎস হলো খেজুর। খেজুরে রয়েছে ভরপুর আয়রন। তাই রক্তস্বল্পতার সমস্যা দূর করতে নিয়মিত খেজুর খেতে  পারেন।

 

  • টমেটো: টমেটো রক্তস্বল্পতা দূর করতে খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখে । কারণ টমেটোতে থাকে  আয়রন, ভিটামিন ‘সি’ ও লাইকোপেন যা রক্তাস্বল্পতাসহ নানা রোগের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে সক্ষম। তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় টমেটো রাখতে পারেন। 

 

  • চীনাবাদাম: চীনাবাদামে আয়রন থাকে। শরীরে আয়রন এর পরিমান বাড়িয়ে রক্তস্বল্পতা দূর করতে নিয়মিত চিনাবাদাম খেতে পারেন। 

 

  • শাক সবজি: শাক সবজিতেও প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। বিভিন্ন রকম সবজি, যেমন কচু শাক, কচুর লতি, কচু, পালং শাক, বিট, লেটুস, ব্রকোলি, ধনিয়া পাতা এবং পুদিনা পাতা নিয়মিত খেলে রক্তশূন্যতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কারণ এই শাক সবজিগুলোতে আয়রনের পাশাপাশি ফলিক এসিড এবং অনেক  ভিটামিন আছে যেগুলো রক্তের হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।

 

  • ডাল: রক্তস্বল্পতা দূর করতে প্রতিদিন মসুর, মুগ কিংবা মাসকলাইয়ের ডাল খেতে পারেন। কারণ এই খাবারগুলিতে প্রচুর ফোলেট পাওয়া যায়। ফোলেট রক্তের হিমোগ্লোবিনের  পরিমান বাড়াতে  সাহায্য করে। তাই আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফোলেটসমৃদ্ধ খাবার রাখা অত্যন্ত জরুরি।

 

  • ডিম: ডিমের মধ্যে রয়েছে প্রোটিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। রক্তস্বল্পতা কমিয়ে শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়াতে ডিম খুব উপকারী একটি খাবার। ডিমের কুসুমের মধ্যে রয়েছে আয়রন। এটি শরীরে লোহিত রক্তের কণিকার পরিমাণ বাড়ায়। তাই রক্তসল্পতা হলে ডিম খাওয়া দরকার। 

 

  • ভিটামিন সি জাতীয় ফল: আমাদের দেহে রক্তকোষ তৈরিতে ভিটামিন সি জাতীয় যে কোন ফল এর উপকারিতা অনেক বেশি। তাই প্রতিদিন ভিটামিন সি জাতীয় ফল খাওয়া উচিত দেহের রক্তশূন্যতা দূর করার জন্য।

 

  • মধু: আয়রনের একটি ভালো উৎস হলো মধু। মধুতে আয়রন ছাড়াও কপার ও ম্যাঙ্গানিজ আছে। এই উপাদানগুলো শরীরে হিমোগ্লোবিন এর উৎপাদনে সহায়তা করে। তাই রক্তশূন্যতা দূর করতে প্রতিদিন ১ চামচ মধুর সাথে পরিমাণগত লেবুর রস মিশিয়ে পান করার চেষ্টা করুন।

 

  • সয়াবিন: সয়াবিনে রয়েছে উচ্চমাত্রায় আয়রন এবং ভিটামিন। এর মধ্যে থাকা সাইটিক এসিড রক্তস্বল্পতার সঙ্গে লড়াই করে রক্তসল্পতা দূর করে । সয়াবিনের রয়েছে কম পরিমাণ চর্বি ও অধিক পরিমাণে প্রোটিন। প্রোটিনও এনিমিয়া প্রতিরোধে খুবই উপকারী।

শরীরে রক্ত কমে গেলে কিভাবে বুজবো ?

 

শরীর দুর্বলতা, মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা, অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে ওঠা, বুক ধড়ফড় করা, মাথা ঝিমঝিম করা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। রক্ত কমে গেলে কি খাওয়া উচিৎ? রক্ত কমে গেলে আয়রন এবং ভিটামিন বি জাতীয় খাবার খাওয়া উচিৎ। রক্তস্বল্পতা হলে কাজকর্মে অনীহা, অনিদ্রা, অল্পতে মনোযোগ নষ্ট হওয়া, জিহ্বা ও ঠোঁট মসৃণ ও সাদাটে হয়ে যাওয়া, মুখের কোনায় ও জিহ্বায় ঘা হওয়া, নখে ভঙ্গুরতা বা চামচের মতো গর্ত হওয়া, অরুচি, বমি বমি ভাব, হজমে ব্যাঘাত ঘটা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া সহ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

আরো পড়ুনঃ কোন ভিটামিনের অভাবে ঘুম কম হয়

 

শরীরে রক্ত কমে যাওয়ার কারণ কি ?

 

 প্রচুর পরিমানে রক্তপাত, রক্তের লোহিত কণিকার উৎপাদন হ্রাস এবং লোহিত রক্তকণিকা ভাঙ্গনের কারণে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। রক্তপাতের কারণগুলির মধ্যে রয়েছে ট্রমা এবং গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল রক্তপাত। রক্ত উৎপাদন কম হলে শরীরে রক্ত কমে যায়। উৎপাদন হ্রাসের কারণগুলির মধ্যে রয়েছে আয়রনের ঘাটতি, ভিটামিন বি 12 এর অভাব, থ্যালাসেমিয়া এবং বেশ কয়েকটি অস্থি মজ্জার টিউমার।

 

রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে কি শরীরের রক্ত কমে যায় ?

 

হিমোগ্লোবিন হলে রকের অক্সিজেন পরিবহনের মাধ্যম। আর যখন রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমান কমে যায়। তখন রক্তের অক্সিজেন বহন করার ক্ষমতা হ্রাস পায়। এর পরে রক্তশূন্যতা ধীরে ধীরে হয়, তখন লক্ষণগুলি প্রায়ই অস্পষ্ট হয়, যেমন ক্লান্তি বোধ, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা এবং ব্যায়াম করার কম ক্ষমতা তৈরী হয়। 

 

শরীরে রক্ত কমে যাওয়ার সমস্যা দূর করতে যেসব অভ্যাস বদলাতে হবে?

 

  • খাবার খাওয়ার এক ঘণ্টা আগে–পরে চা, কফি, কোনো ধরনের কোমল পানীয় খাওয়া থেকে ধরে থাকতে হবে। কারণ কোমল পানীয় খেলে খাবারের আয়রন শরীরে ঠিকভাবে শোষিত হতে পারে না। তাই এই অভ্যাস বদলে ফেলুন।

 

  • খালিপেটে ফল খাওয়া যাবে না। কারণ ফলের ভিটামিন সি খাবারের আয়রনকে শোষিত করে পেলে।

 

  • ইসবগুল খাবেন খাবার খাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক আগে বা পরে। না হলে ফাইবারের ছাঁকনিতে পুষ্টির বেশ কিছুটা আটকে যেতে পারে।

 

  • জাঙ্ক ফুড হল মুখরোচক খাবার এতে কোনো পুষ্টিগুণ নেই। রক্ত কমে গেলে কি খাওয়া উচিৎ ?রক্ত কমে গেলে আয়রন এবং ভিটামিন বি যুক্ত খাবার খাওয়া উচিৎ। কিন্তু জাঙ্ক ফুডে কোনো আয়রন বা ভিটামিন বি নাই এছাড়া এটি বেশি খেলে শরীরের জন্য ক্ষতি হতে পারে।

 

  • মাছ, মাংস ও ডিম খাওয়ার পর দুধের তৈরী খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

আপনার শরীরে রক্ত কমে যাওয়ার সমস্যা দূর করতে এসব অভ্যাস গুলো বদলাতে হবে। 

 

Leave a Comment